আসন নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের বড় টানাপড়েন

 প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:২৮ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

আসন নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের বড় টানাপড়েন

আসন বণ্টন নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটে। বিশেষ করে, জামায়াতের সঙ্গে চরমোনাই পিরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের বড় ধরনের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। যার কারণে, নির্বাচনি আসন সমঝোতা নিয়ে গতকাল বুধবার সকালে যৌথ সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দিয়ে বিকালে তা স্থগিত করা হয়। জোটের ১১টি দলের কে কোন আসনে প্রার্থী হবেন, তা ঘোষণা করার কথা ছিল এই সংবাদ সম্মেলনে। তবে, সব পক্ষই বলছে, সমঝোতা ভেস্তে যায়নি, পারস্পরিক আলোচনা চলমান রয়েছে। ইসলামী আন্দোলন সূত্রে জানা গেছে, আসন নিয়ে মতৈক্য না হওয়ার কারণেই এ সংবাদ সম্মেলন ভেস্তে গেছে। ইসলামী আন্দোলন ৫০টি আসন চাইছে, কিন্তু জামায়াত ৪০টির বেশি আসন ছাড়তে রাজি নয়। এ নিয়ে ইসলামী দল দুটির সমঝোতা আটকে যায়।


গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জামায়াত সাংবাদিকদের এক আমন্ত্রণপত্র পাঠায়। সেখানে বলা হয়, ‘আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলের আসন সমঝোতা বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা প্রদানের লক্ষ্যে আজ বিকাল সাড়ে ৪টায় রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইডিইবি) মুক্তিযোদ্ধা হলে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। এতে ১১ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন।’মাত্র তিন ঘণ্টার মাথায় বেলা সোয়া ২টার দিকে জামায়াত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ‘আজ ১৪ জানুয়ারি বিকাল সাড়ে ৪টায় আন্দোলনরত ১১ দল ঘোষিত সংবাদ সম্মেলন অনিবার্য কারণবশত স্থগিত করা হয়েছে।’ এ ব্যাপারে ১১ দলের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সাংবাদিকদের জানান, অনিবার্য কারণে সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে।  সংবাদ সম্মেলনের তারিখ পরে জানানো হবে।

গতকাল বিকালে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান তার ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘প্রিয় সহকর্মীবৃন্দ, বহু ত্যাগ এবং কুরবানির সিঁড়ি বেয়ে প্রিয় সংগঠন ও জাতি মহান আল্লাহ তাআলার একান্ত মেহেরবানিতে এ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সময়টা জাতীয় জীবনের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বাঁক। এ সময় সকলকে সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে, দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। কারো ব্যাপারে কোনো ধরনের বিরূপ আচরণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আশা করি, আমরা সবই সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেব।’

যৌথ সংবাদ সম্মেলন স্থগিত হওয়ার পর দলীয় এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন জোটের ইঙ্গিত দেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান। রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ২০ তারিখ (২০ জানুয়ারি) হলো মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি। তাই না? ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের আগ পর্যন্ত  যে কোনো কিছু ঘটতে পারে। তিনি জানান, তাদের প্রতি যাদের শ্রদ্ধা রয়েছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

জোটের আসন ভাগাভাগির টানাপড়েন নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে গাজী আতাউর বলেন, আশা করা হয়েছিল, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আগে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু মঙ্গলবার পর্যন্ত সেটি হয়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার বৈঠক করে দলের সব স্তরের নেতাদের মতামত নেওয়া হয়েছে। মাঠের তথ্য নেওয়া হয়েছে, প্রার্থীদের কথা শোনা হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে গতকাল তাদের মজলিসে আমেলার (দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম) বৈঠক হয়েছিল। যাদের নিয়ে শুরু থেকে পথচলা, তাদের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন যোগাযোগ করছে।

‘ওয়ান বক্স’ পলিসির আওতায় আগামীর পথচলা কেমন হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, দুই-এক দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আমির বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঘোষণা দিয়ে এসেছেন, তারা সামনে ঐক্যবদ্ধভাবে সরকার গঠন করার জন্য আলোচনা করবেন। এ আলোচনা নির্বাচনের পরেও হবে। জাতীয় সরকারের ব্যাপারেও তিনি কথা বলেছেন। জামায়াতের আমির বলেছেন, খালেদা জিয়া ঐক্যের যে পাটাতন তৈরি করেছিলেন, সেই ঐক্যের পাটাতনের ওপরে দাঁড়িয়ে তারা আগামীতে রাষ্ট্র চালাবেন। তবে সেই ঐক্যের পাটাতন খালেদা জিয়ার জীবদ্দশাতেই ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সেই পাটাতন আবার মেরামত করার জন্য বলেছেন জামায়াতের আমির। এটা ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে একটু সংশয় তৈরি করেছে, জামায়াত কি জাতীয় পার্টির মতো ভূমিকা পালন করবে?

জামায়াতের জোটে বিভাজন বিএনপিকে সুবিধা করে দেবে কি না, এমন প্রশ্নে গাজী আতাউর রহমান বলেন, এটা তো স্বাভাবিক। এটার দায় কী আমাদের? এটা এখানে যদি কেউ অ্যাডভান্টেজ পায়, সেটা পেতে পারে। নতুন করে বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনা হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিএনপি তো ফিক্সড করে ফেলেছে, তাদের জোট এবং তাদের যে ডিজাইন, সেটা তো হয়ে গেছে।

সেক্ষেত্রে ইসলামী আন্দোলন এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, প্রশ্নের জবাবে গাজী আতাউর বলেন, এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অনেকের সঙ্গেই তাদের আলোচনা চলছে। আলোচনার পর দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে অগ্রসর হবেন তারা। যাদের ইসলামী আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধা আছে, তাদের নিয়ে পথ চলবেন বলে জানান তিনি। সেক্ষেত্রে শুরুতে আসন সমঝোতার আলোচনায় থাকা পাঁচটি ইসলামী দলের জোট হবে কি না, তাও তিনি স্পষ্ট করেননি।

গাজী আতাউর বলেন, পাঁচ দলের বাইরেও অনেকেরই আমাদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। ১২ দলের মধ্যে যারা আছে, এদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। এর বাইরে আরো আলোচনা হচ্ছে। আলোচনা হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে। সমঝোতার সুযোগও রাখছে

জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা ভেস্তে গেছে, এমন পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি বলে জানান ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র। তিনি বলেন, নির্বাচনি আসন সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়া বা কাউকে বের করে দেওয়ার মতো অবস্থা এখনো তৈরি হয়নি। ইসলামী আন্দোলন জাতীয় ঐক্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। নানা প্রতিকূলতা থাকলেও ন্যূনতম সমঝোতা যাতে থাকে, ইসলামী আন্দোলন সেই চেষ্টা করে যাবে।

এই জোটে জটিলতার ব্যাখ্যায় গাজী আতাউর বলেন, আসন সমঝোতার ক্ষেত্রে কিছু সংকট আছে, যা অস্বীকারের সুযোগ নেই। কারো চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত ইসলামী আন্দোলনকে মেনে নিতে হবে, এই রাজনীতি তাদের দল অতীতেও করেনি। কেউ ইসলামী আন্দোলনকে অবহেলা করলে তাও তারা মেনে নিতে পারবেন না।

গাজী আতাউর বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মানের ভিত্তিতে এগোতে চেয়েছিল ইসলামী আন্দোলন। সমঝোতার মানে কেউ কারো ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারবে না। সেই পরিবেশ থাকলে আসন কমবেশি নিয়ে সমস্যা থাকতো না। ৩০০ আসনেই একটি দল প্রচার করছে, জোটের পক্ষ থেকে তাদের দলের প্রার্থীকে চূড়ান্ত করা হয়ে গেছে। এসব মিথ্যাচার করলে তাদের সঙ্গে সামনে পথচলা কষ্টকর হয়ে যাবে।

বিভিন্ন জনমত জরিপের মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে দাবি করে গাজী আতাউর রহমান বলেন, অনেকে সমীক্ষাকে মানদণ্ড ধরেন। এসব জরিপ কারা করছে, মানুষ সেটি বোঝে। এগুলো বেইনসাফি করার পথ উন্মুক্ত করছে। এসব ভাঁওতাবাজি জরিপ দিয়ে নির্বাচনের পথরেখা নির্ধারণ করলে সেখানে বিপর্যয় হবে।

সর্বশেষ তথ্য মতে, জামায়াত আরেকটু ছাড় দিয়ে ১১ দলের শরিক ইসলামী আন্দোলনকে ৪৫ আসন ছাড়তে রাজি রয়েছে। পাঁচটি আসন উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব প্রস্তাব রয়েছে। এগুলোতে ‘দাঁড়িপাল্লা’ এবং ‘হাতপাখা’ উভয় প্রতীকের প্রার্থী থাকবে। তবে একসময়ে ১৫০ আসন চাওয়া ইসলামী আন্দোলন এখন কমপক্ষে ৬৫ আসন চায়।  মামুনুল হকের খেলাফতকে ১৬টি আসন ছাড়তে রাজি হয়েছে জামায়াত। এই দলকেও কয়েকটি আসন উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব করেছে। তবে ২৫ আসনের কমে রাজি হচ্ছেন না মামুনুল হক। তিনি জোটে থাকলে, ইসলামী আন্দোলনকে নিয়েই থাকতে চান।

এনসিপিকে ৩০, খেলাফত মজলিস এবং এলডিপিকে পাঁচটি করে, এবি পার্টিকে তিনটি; বিডিপি, খেলাফত আন্দোলন,  নেজামে ইসলাম পার্টি ও খেলাফত আন্দোলনকে চার-পাঁচটি করে আসন ছাড়তে রাজি হয়েছে জামায়াত। আর বাকি ১৯০ আসনে নির্বাচন করতে চায় জামায়াত। তবে, এবি এবং খেলাফতও আরো কয়েকটি আসন চায়।

মঙ্গলবার মধ্যরাত পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় মজলিসের শুরার বৈঠক চলে রাজধানীর রামপুরার একটি মাদ্রাসায়। জামায়াত ৪৫টির বেশি আসন ছাড়তে রাজি না হওয়ায় করণীয় কী—এ প্রশ্নে শুরার সদস্যদের কাছে মতামত চান চরমোনাই পীর ও ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম।

২৬৬ আসনে প্রার্থী দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন। মজলিসে শুরার অধিকাংশ সদস্য মতামত দেন, এক বছরের  বেশি সময় ধরে এই প্রার্থীরা মাঠে কাজ করছেন, তারা নির্বাচন করতে না পারলে ক্ষুব্ধ হবেন। তাই অন্তত ৭০ আসনে নির্বাচন করতে হবে। শুরার কিছু সদস্য মতামত দেন, জামায়াতের ছেড়ে দেওয়া ৪০-৪৫ আসন নয়, এককভাবে নির্বাচন করা উচিত। জামায়াত নবগঠিত এনসিপিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। চরমোনাই পীরকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জোটে থাকা উচিত নয়। এ পরিস্থিতিতে দলীয় আমির শুরা সদস্যদের জানিয়ে দেন, আসন সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত জামায়াতের ডাকা সংবাদ সম্মেলনে যাবেন না। জোটে থাকা, না থাকার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পরিষদ মজলিসে আমেলার বৈঠকে। তবে, গতকাল দুপুর  থেকে বিকাল পর্যন্ত জ্যেষ্ঠ নেতাদের বৈঠকেও সিদ্ধান্ত হয়নি।

ইসলামী আন্দোলনের মতো মামুনুল হকের দলও প্রত্যাশিত আসন চূড়ান্ত হওয়ার আগে গতকাল যৌথ সংবাদ সম্মেলনে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। জামায়াত সূত্র জানায়, চরমোনাই পীরের অনুপস্থিতিতে প্রার্থী ঘোষণা করা হলে জোটের ভাঙন নিশ্চিত ছিল। কিন্তু মামুনুল হকও অস্বীকৃতি জানানোর কারণে শেষ পর্যন্ত সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়।আসন নিয়ে অসন্তুষ্টি থাকলেও গতকাল বাংলাদেশ খেলাফতের বৈঠকেও জোট অটুট রাখতে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। দলটির যুগ্ম-মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে আসন বণ্টনের সুরাহা হবে বলে আমরা আশাবাদী। তাই সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে।  আতাউর রহমানের বরাতে ইসলামী আন্দোলনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থানের পরে দেশ, জাতি ও ইসলামের স্বার্থে চরমোনাই পীর ইসলামপন্থিদের ‘এক বাক্স’ নীতি ঘোষণা করেন। সেই নীতিতে ইসলামী আন্দোলন এখনো অটল থেকে কাজ করে যাচ্ছে।


জাতীয় এর আরও খবর: