মানব সেবায় জান্নাত মেলে

 প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০১৯, ০২:০৬ অপরাহ্ন   |   রাজধানী

মানব সেবায় জান্নাত মেলে

গেণ্ডারিয়া রেললাইনের পথ ধরে প্রতিদিন আমাকে হাঁটতে হয়। আমি হেঁটে চলি আমার গন্তব্যের দিকে। লাইনের দু’ধারে কিছু বস্ত্রহীন অনাহারি শিশুকে দৌড়াতে দেখি। এদের কেউ কেউ আবার দৌড়াতেও পারে না রোগা ও নাওয়া-খাওয়াহীন শরীর নিয়ে। দূরে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে।

সেদিন কথা হয়েছিল এমনই একজনের সঙ্গে। নাম জানাল সাইদুল। বয়স ১১-১২ হবে। বাবার নাম জিজ্ঞেস করতেই বলল, জানি না। মায়ের নাম রহিমা খাতুন। আগে মায়ের সঙ্গেই থাকত। এখন মা কোথায় থাকে জানে না সাইদুল। কথা এগিয়ে চলে সাইদুলের সঙ্গে।

কিন্তু সে আর এগিয়ে নিতে চায় না আলাপ। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর রোগা রোগা নিঃশ্বাস ফেলে বলে, আজ কিছুই খাইনি স্যার! ঘড়ির কাঁটা তখন ৩টা ছুঁই ছুঁই। এত বেলা হয়েছে অথচ কিছুই খায়নি ছেলেটি। কে খাওয়াবে তাকে? তার যে কোনো শিকড় নেই। নেই বাবার পরিচয় আর মায়ের আশ্রয়। যে যার পেট নিয়ে তার মতো করে বেঁচে আছে। কিছুক্ষণ চুপ করে আছি আমি। সঙ্গে ছিল আমার খুব কাছের একজন বন্ধু। ছেলেটার হাত ধরে বন্ধুটি জানতে চাইল, কী খাবে তুমি? সাইদুল বলল, ভাত খাইতে মন চায় স্যার। দুদিন ধইরা ভাত খায়নি। বন্ধু আর আমি তাকে নিয়ে গেলাম রেস্তরাঁয়।

বিষয়টি নিয়ে ভাবলাম আমি। ভাবলাম পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কথা। ধর্মের নির্দেশনার কথা। একবার মনে হতে থাকে এসব নিয়ে ভাবার কী দরকার আছে? এত সময় কই এদের নিয়ে ভাবার! আমরা বরং আমাদের ইমান-আমল নিয়ে কবরে ফিরে যেতে পারলেই হয়। তারপর সোজা জান্নাতে। আমার সামনে জান্নাতের পথ! পেটপুরে খেয়েদেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে মুখে আলহামদুলিল্লাহ বলে আমলের পাল্লা ভারী করে প্রভুর জান্নাত কিনে নেব! আমি ভাবি, ভাবতে থাকি।

সূরা মাউনের সত্য বাণীগুলো কাঁপিয়ে দেয় আমার ভেতর। প্রভুর বাণী মনে এলে ভারী হয়ে ওঠে মনোজগৎ। আমি পাঠ করি, ‘আপনি কি দেখেছেন ধর্মের ব্যাপারে মিথ্যারোপকারীকে? দেখে নিন তাকে; সে ইয়াতিমকে তাড়িয়ে দেয়, নিঃস্বকে খাবার দিতে চায় না। অতএব, এমন নামাজিদের জন্য ধ্বংস অনিবার্য। যারা তাদের নামাজের ব্যাপারেই উদাসীন। এরা নামাজি সাজে মানুষকে দেখানোর জন্যই।

এরা নিত্যপ্রয়োজনীয় সংসার সামগ্রী পর্যন্ত কাউকে দেয় না।’ আরও বড় সতর্কবাণী রয়েছে সূরা মুদাসসিরের ৪২ থেকে ৪৪ নং আয়াতে। জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হিসেবে নামাজ ত্যাগ ও নিঃস্ব-অভাবীদের খোরপোশের ব্যবস্থা না করাকেই দায়ী করা হয়েছে। কোরআনের ভাষ্যমতে জাহান্নামিদের জিজ্ঞেস করা হবে, ‘তোমাদেরকে কিসে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? উত্তরে তারা বলবে, আমরা সালাতি জিন্দেগির চর্চা করিনি। আর সহায়হীন-অভাবীদের খাদ্যের সংস্থাপন করিনি।

’ শুধু নামাজ-রোজা দিয়ে জান্নাতের আশা করা যায় না। সঙ্গে সঙ্গে অসহায়, অভাবীদের সংস্থাপনের মাধ্যমে স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে। তাই আসুন আমরা অসহায় ছিন্নমূল মানুষের পাশে সাধ্যমতো দাঁড়িয়ে পরিপূর্ণ ধর্মকর্মে মনোনিবেশ করি। না হয় বৃথা যাবে আমাদের এসব ইবাদত বন্দেগি।