মিরাজ ও সালাতে প্রেমময়ের মিলন

 প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০১৯, ০২:০৯ অপরাহ্ন   |   রাজধানী

মিরাজ ও সালাতে প্রেমময়ের মিলন

রহস্যময় মিরাজ আল্লাহর পরিচয় লাভের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। যা রাসূল পাক (সা.)-এর সব মোজেজার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ মোজেজা। এটি ইলমে তাসাউফ বা মারেফাতের নিগূঢ় রহস্যের দুয়ার উন্মোচন করেছে। যাতে রয়েছে নিরাকার প্রভুর দর্শন লাভ এবং স্বল্প সময়ে অসীম পথ পাড়ি দেয়ার জ্ঞান-বিজ্ঞান। তাছাড়া মিরাজের অসংখ্য অলৌকিক ঘটনায় রাসূল (সা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়েছে।

বায়তুল মোকাদ্দাসে নামাজে সব নবীর ইমাম হওয়ায় প্রমাণিত হয়েছে হজরত মুহাম্মদ (সা.) সৃষ্টির সেরা সাইয়্যেদুল মুরসালিন। আল্লাহর নিকটতম ফেরেশতা জিব্রাইল আ. সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছে বলেন, এর ঊর্ধ্বে যাওয়ার সাধ্য আমার নেই, গেলে নূরের পাখা পুড়ে ছাই হয়ে যাবে আমার। রাসূল (সা.) বাকি পথ রফরফে সাওয়ার হয়ে যান এবং আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্যে পৌঁছে কথোপকথন করেন।

নামাজ হল মিরাজের শ্রেষ্ঠ উপহার। তাই মিরাজকে বুঝতে হলে নামাজের হাকিকত জানতে হবে। আল্লাহর পরিচয় জানতে হবে। তার সঙ্গে মিলনের আকাঙ্ক্ষা অন্তরে জাগ্রত করতে হবে। তাহলেই রাসূল (সা.)-এর বাণী, ‘আস-সালাতু মিরাজুল মুমিনিন’-এর সঠিক মর্ম উপলব্ধি করা যাবে।

আধ্যাত্মিক জ্ঞান না থাকায় অনেকে বলেন, নিরাকার আল্লাহকে দেখা অসম্ভব। তাই তারা মিরাজের ঘটনা পরিপূর্ণ বিশ্বাস করতে পারেন না। ‘আস-সালাতু মিরাজুল মুমিনিন’-এর মর্মার্থ না জানায়, নামাজে আল্লাহর সঙ্গে মিলনের কথাও মানে না তারা। নিজেরা মিরাজ করতে না পারায়, অন্য কেউ সেটা পারে তা মানতে নারাজ। ফলে তারা আল্লাহর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের শান-মান সম্পর্কে ওয়াকেবহাল নন এবং তাদেরকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করতে চান না।

আজকের তথাকথিত আলেমরা রাসূল (সা.), তার আহলে বাইত, সাহাবায়ে কেরাম ও অলি-আউলিয়াদের যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারে না। অজ্ঞতার কারণে কাফেররা মিরাজের ঘটনা অস্বীকার করেছিল। রাসূল (সা.) কতভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, যাতে তারা বিশ্বাস করে, কিন্তু কাফেররা উপহাস ও বিদ্রূপ করতে ছাড়েনি। তিনি পথে একটি কাফেলা ও তাদের হারিয়ে যাওয়া উটের বর্ণনা দিয়েছিলেন, মসজিদুল আকসার সিঁড়ির সংখ্যা বলেছিলেন। কিন্তু কাফেররা বিশ্বাস করল না। এমনকি অনেক নও মুসলিমও ঈমানহারা হয়েছিল। অথচ মিরাজের ঘটনা অকপটে বিশ্বাস করায় হজরত আবুবকর (রা.) ‘সিদ্দিক’ বা ‘সত্যবাদী’ উপাধি পেয়েছিলেন।

এখনও অনেকেই আছেন যারা রাসূল (সা.) কে সাধারণ মানুষ প্রমাণ করতে ব্যতিব্যস্ত। ‘নামাজ হল বিশ্বাসীদের জন্য মিরাজ’- এটি হাদিস নয়, তা প্রমাণ করতে সচেষ্ট। এভাবে তারা মিলাদ পড়া, কেয়াম করা, ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন করা, শবে বরাত পালন করা ইত্যাদি বরকতময় ইবাদত-বন্দেগি থেকে মানুষকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছে। বাজারে প্রচলিত এ ধরনের অসংখ্য প্রচার-প্রচারণা দেখলে সহজে তাদের জ্ঞানের দৌরাত্ম কিংবা দূরভিসন্ধি উপলব্ধি করা যায়। মিরাজের আয়াত যদি আল-কোরআনে না আসত তবে তারা হয়তো মিরাজের ঘটনাবলীও অস্বীকার করত। কোরআনের বর্ণনায় মিরাজের রাতে কোনো মাধ্যম ছাড়াই রাসূল (সা.) আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথন করেন। তখন তাদের অবস্থান ছিল দুই ধনুকের ব্যবধান বা তার চেয়েও নিকটবর্তী।

মিরাজ থেকে ফেরার সময় রাসূল (সা.) উম্মতদের জন্য প্রথমত. পঞ্চাশ ওয়াক্ত এবং পরবর্তীতে কয়েক ধাপে কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নির্দিষ্ট করে আনেন। নামাজের সঙ্গে মিরাজের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত হওয়ায় নামাজে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভের বিষয়টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও যৌক্তিক। হাদিসে কুদসিতে আছে, জিবরাইল (আ.) এসে বললেন, হে রাসূল (সা.) আল্লাহ তায়ালা আপনাকে সালাম দিয়েছেন এবং বলেছেন, কোনো বান্দা যখন নামাজের জন্য আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে তখন আমার এবং ওই বান্দার মধ্যেকার পর্দা উঠিয়ে দেয়া হয়।

নামাজে আল্লাহ ও বান্দার মাঝে পর্দা উঠিয়ে দিলে বান্দা সরাসরি আল্লাহর মুখোমুখি হন। তাই রাসূল (সা.) নামাজে ‘হুজুরে দিল’ বা একাগ্রতার বিষয়ে বলেছেন, এটি নামাজের প্রাণ। তিনি আরও বলেছেন, তুমি এমনভাবে সালাত আদায় কর, যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ, যদি তুমি দেখতে অক্ষম হও, কিংবা দেখতে না পাও, তাহলে মনে কর আল্লাহ তোমাকে দেখছেন। হজরত উমর (রা.)ও এভাবে দর্শন লাভের দাবি করে বলেছেন, প্রভু প্রদত্ত নূরের ছটায় আমার কলব প্রভুকে দর্শন করেছে।

রাসূল (সা.) আরও বলেছেন, ‘কেউ নামাজে দাঁড়ালে সে মূলত প্রভুর সঙ্গে কথোপকথন করে। তাই সে যেন দেখে, কীভাবে সে কথোপকথন করছে।’ রাসূল (সা.) অন্যত্র বলেছেন, ‘নামাজে বান্দা তার রবের সঙ্গে খুব আপনভাবে কথা বলে।’ তাই সালাতে বিনয়াবনত ও একাগ্রতার গুরুত্ব দিয়ে পবিত্র কোরআনে আল্লাহর নির্দেশ, ‘তোমরা আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান হও বিনীতভাবে।’ (সূরা- বাকারা, আয়াত- ২৩৮)

এসব আয়াত এবং হাদিসের বর্ণনায় এটি পরিষ্কার যে, নামাজের সময় বান্দা আল্লাহর সামনেই অবস্থান করেন যা মিরাজেরই নামান্তর। হজরত আলী (রা.)-এর নামাজের দৃষ্টান্ত থেকে সবার শিক্ষা নেয়া উচিত। এক যুদ্ধে হজরত আলী (রা.)-এর পায়ে তীর বিদ্ধ হয়েছিল। তিনি তীরের আঘাতের যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়লেন। অনেক চেষ্টা করেও তীর বের করা যাচ্ছিল না। হজরত আলী (রা.) নামাজের নিয়ত করলে রাসূল (সা.)-এর ইশারায় কয়েকজন সাহাবি সজোরে টেনে তীরটি বের করে ফেললেন। রক্তে জায়নামাজ ভিজে গেল। কিন্তু হজরত আলী (রা.) কিছুই টের পেলেন না। নামাজ শেষে জায়নামাজে রক্ত দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন এ কিসের রক্ত।

হজরত আলী (রা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেন, আপনি কি আল্লাহকে দেখেছেন যে এভাবে তার ইবাদত করছেন? উত্তরে তিনি বললেন, যে আল্লাহকে আমি দেখি না বা জানি না আমি তাঁর ইবাদতও করি না, অবশ্য দেখা বলতে আমি চোখ দিয়ে দেখা নয়, বরং অন্তর দিয়ে দেখাকে বোঝাচ্ছি। অন্যত্র তিনি বলেছেন, আমি এমন কোনো কিছু দেখিনি যার সঙ্গে আগে ও পরে আল্লাহ ছিলেন না।

মিরাজের রহস্য জানতে ইলমে তাসাউফ বা মারেফাতের জ্ঞান চর্চা জরুরি। কলবি বা আত্মিক জ্ঞান আল্লাহপ্রদত্ত এমন একটি অদৃশ্য জ্ঞান যা ইলমে শরিয়ত অনুযায়ী চরিত্র গঠন ও নেক আমলের মাধ্যমে লাভ করা যায়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেছেন, ‘আমি রাসূল (সা.)-এর কাছ থেকে জ্ঞানের দুটি পাত্র অর্জন করেছি। একটি তোমাদের মধ্যে বিতরণ করেছি অন্যটি করিনি। যদি করতাম তবে আমার কণ্ঠদেশ কর্তিত হতো।’ হজরত ইমাম মালিক (রা.) বলেছেন, ‘যিনি তাসাউফ গ্রহণ করলেন কিন্তু ফিকহ গ্রহণ করলেন না, তিনি নিশ্চই কাফের। আর যিনি ফিকহ গ্রহণ করলেন কিন্তু তাসাউফ গ্রহণ করলেন না, তিনি নিশ্চয়ই ফাসেক। আর যিনি দুটো জ্ঞানই গ্রহণ করলেন এবং সেই অনুযায়ী আমল করলেন, তিনিই মুহাক্কেক বা প্রকৃত দ্বীন গ্রহণ করলেন।’

তাই যদি কেউ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ ও মিরাজ দর্শন করতে চান, তাকে অবশ্যই আত্মিক জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি নিয়মিত সালাত আদায় করতে হবে। কেননা ইতিহাসে দেখা যায়, সব নবী-রাসূল ও অলি-আউলিয়ারা সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেছেন। তাই শামসুল উলামা আল্লামা হজরত শাহ সূফি সৈয়্যেদ আহমদ আলী ওরফে হজরত জানশরীফ শাহ সুরেশ্বরী (রহ.) ‘নূরেহক গঞ্জেনূর’ গ্রন্থে লিখেছেন,