পাম চাষ খুবই লাভজনক

 প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০১৯, ০৪:০১ অপরাহ্ন   |   প্রশাসন

পাম চাষ খুবই লাভজনক

দেশের কৃষিখাতে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। হাইব্রিড বীজ ও কৃষকের অদম্য প্রচেষ্টায় এই উন্নতি সাধিত হয়েছে। দেশ এখন খাদ্য উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংভর হয়েছে। বিশেষ করে চাল, সবজী, মাছ, মাংস, ডিম ও ফল উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পন্ন হয়েছে। উপরন্তু এসব ক্ষেত্রে কিছু রফতানিও হচ্ছে। তবুও অনেকের আশংকা, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংভরতা বেশিদিন থাকবে না। কারণ, দেশে একদিকে, ক্রমাগত মানুষ বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্যদিকে বিভিন্নভাবে ফসলের জমি হ্রাস পাচ্ছে। ফলে অদূর ভবিষ্যতেই দেশে বড় ধরনের খাদ্য সংকট দেখা দিবে। হ্যাঁ, এ কথা ঠিক যে, দেশে ক্রমান্বয়ে মানুষ বাড়ছে ও চাষযোগ্য জমি হ্রাস পাচ্ছে; কিন্তু পাশাপাশি আশার আলোও আছে। তা হচ্ছে: দিনদিন অধিক ফলনশীল এবং বন্যা, খরা ও লবণাক্ত পানি সহিষ্ণু বীজ উদ্ভাবন হচ্ছে এবং তার ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে ফসলের উৎপাদন হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া, নদী, বিল, হাওড় ও সমুদ্রের উপকূলে ভাসমান খাঁচায় মাছের চাষ ও ভাসমান টিলায় বিভিন্ন ফসলের চাষ শুরু হয়েছে। টার্কি মুরগি চাষ মাংস খাতে ব্যাপক উন্নতি ঘটাচ্ছে। অর্থাৎ কৃষিখাতে নব দিগন্তের সূচনা হচ্ছে। তাই দুঃশ্চিন্তার কারণ নেই। অবশ্য কৃষিখাতে ঈর্ষণীয় উন্নতি হলেও কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদনে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। যেমন: গম এবং পিঁয়াজ, রসুন, আদাসহ সব ধরনের মসল্লা ও ভোজ্য তেল উৎপাদনে পিছিয়ে আছে দেশ। ফলে এসবের বেশিভাগ আমদানি করে চাহিদা পূরণ করতে হয়। এতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় ঘটে। তাই দেশে এসব পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তন্মধ্যে ভোজ্য তেল সর্বাধিক। যার অন্যতম পাম অয়েল। 

বাঙালি রসনা বিলাসী, যা বিশ্বব্যাপী খ্যাত। আর এই সুস্বাদু রান্নার জন্য সব ধরনের মাত্রাতিরিক্ত মসল্লা ও ভোজ্য তেল অবশ্যম্ভাবী, যা ব্যবহার করতে বঙ্গনারীরা বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করে না, প্রয়োজনে ঋণ করে হলেও। এসব অপরিহার্য খাদ্য পণ্যের বেশিরভাগই আমদানি করতে হয়, যাতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। যেমন: ভোজ্য তেল। দেশে বর্তমানে প্রায় ২৫ লাখ মে. টন ভোজ্য তেল লাগে এবং যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে সরিষা, চীনাবাদাম, তিসি, তিল, সয়াবিন, সূর্যমুখী, ধানের তুষ ইত্যাদি হতে ভোজ্য তেল উৎপাদিত হয়। কিন্তু এসবের উৎপাদন হার খুব কম। তাই চাষিরা এসবের চাষ কমিয়ে দিয়ে অধিক লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ফলে এসব পণ্যের উৎপাদন দিনদিন হ্রাস পাচ্ছে। সে কারণে দেশীয় ভোজ্য তেলের মূল্য অধিক। সয়াবিন ও পাম অয়েল, যার আমদানি মূল্য গড়ে টন প্রতি প্রায় এক হাজার মার্কিন ডলার। এই আমদানিকৃত ভোজ্য তেলের মধ্যে পাম অয়েলের পরিমাণ ৬৫% এর মতো।

উইকিপিডিয়া সূত্রে জানা গেছে, পাম এক প্রকার বৃক্ষ জাতীয় ফুলেল উদ্ভিদ। পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতের ২,৬০০ প্রজাতির পাম গাছ আছে। এ গাছ থেকে নানাবিধ দ্রব্য পাওয়া যায়। এটা পরিবেশ বান্ধবও। সর্বোপরি এর তেল কোলস্টেরলমুক্ত। বিশ্বব্যাপী এর ব্যাপক চাষ হয়। পাম চাষ সম্পর্কে আরও জানা গেছে, পাম গাছের বৈজ্ঞানিক নাম- এলিইস গিনি-সিস। আফ্রিকা অঞ্চলে পাম চাষ বেশি হয়। কিন্তু এই অঞ্চল থেকে মালয়েশিয়ায় শোভা-বর্ধনকারী উদ্ভিদ হিসেবে প্রথম পাম গাছ রোপণ করা হয়। পাম গাছ থেকে শুধু পাম অয়েলই হয় না, পাশাপাশি সাবান, কনডেন্সড মিল্ক, নারকেল তেল তৈরির মতো কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয় পাম ফল। পাম গাছের পাতা ও ফলশূন্য কাদির আঁশকে প্রক্রিয়াজাত করে ফাইবার বোর্ড ও চিপ বোর্ড তৈরি করা যায়। গাছের গুঁড়ি থেকে আসবাবপত্রও তৈরি হয়। পাম অয়েল থেকে জ্বালানি তেলও হয়। জমির আইলে, পাহাড়ের পাদদেশে এবং উপকূলেও পাম চাষ করা যায়। বর্তমানে মালয়েশিয়া সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হয়েছে। এই অভাবনীয় উন্নতির পেছনে পাম অয়েলের অবদান সর্বাধিক। মালয়েশিয়ার বিদেশি শ্রমিকের বেশিরভাগই পাম চাষে নিয়োজিত। তন্মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা অনেক। বাংলাদেশেরও উন্নতি ত্বরান্বিত করা সম্ভব দেশব্যাপী প্রয়োজনীয় পাম চাষের মাধ্যমে। সে লক্ষ্যে কোথাও কোথাও পাম গাছের চাষ শুরু করা হয়েছিল গত ’৮০ দশকে। কিন্তু এটা খুব বেশি সম্প্রসারিত হয়নি। মানুষ এতে আগ্রহী হয়ে উঠেনি। অথচ এ দেশের মাটি ও আবহাওয়া পাম চাষের খুবই উপযোগী। উপরন্তু অন্য ফসলের চেয়ে এটা বেশি লাভজনক। এ দেশে উৎপাদিত পাম গাছ থেকে তেল হওয়ার পরিমাণ বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কৃষিবিজ্ঞানী পাম গাছ থেকে তেল করার আধুনিক পদ্ধতিও আবিষ্কার করেছেন। এই তেল ‘তরল সোনা’ হিসেবে খ্যাত বলে জানিয়েছেন এক বিশেষজ্ঞ। উল্লেখ্য যে, অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম অয়েল পরিশোধন করার মতো অনেকগুলো প্লান্ট আছে দেশে। কিছুদিন আগে দেশের এক দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘পাম চাষের মাধ্যমে ভোজ্য তেল উৎপাদন ও রফতানি থেকে বছরে সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। দেশে ভোজ্য তেলের চাহিদা মেটানোর পরও এ পণ্য রফতানি করে দেশের অর্থনৈতিক চেহারাটাই পাল্টে দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া, পাম চাষ, তেল উৎপাদন, দেশে বাজারজাত ও বিদেশে রফতানির কর্মকান্ডে ৩০ লক্ষাধিক লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সাধারণ কৃষকও অর্থনৈতিকভাবে আরও সমৃদ্ধ হবে।’ অন্য এক সূত্রে জানা গেছে, পাম গাছ বাংলাদেশের আবহাওয়ার জন্য উপযোগী ও পরিবেশবান্ধব। বাংলাদেশে ৪/৫ বছর বয়সী একটি পাম গাছ থেকে বছরে ন্যূনপক্ষে ৪০ কেজি পাম অয়েল পাওয়া যায়। একটি পাম গাছ থেকে একটানা ২৫-৩০ বছর পর্যন্ত তেল পাওয়া যায়। পাম ফল থেকে পাম অয়েল আহরণের সময় যে পুষ্টি সমৃদ্ধ পূর্ণ ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য পাওয়া যায়, তা পাম অয়েল বাগানে সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। পাম অয়েল উদ্ভিদ বালাই নিয়ন্ত্রণের কাজে জৈব পদ্ধতিতে ব্যবহার করা যায়। পাম গাছের পাতা জমিতে সার হিসেবে ব্যবহার হয়। এ জন্য বলা যায়, পাম গাছ পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী ও পরিবেশ বান্ধব। পাম তেলে কোলস্টেরলের মাত্রা কম। তাই এটি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। দেশীয় পদ্ধতিতে পাম ফল সংগ্রহ করা সহজ। পাকা পাম ফল সংগ্রহ করে পানিতে সিদ্ধ করা হয়। অতঃপর হাত দ্বারা অথবা গামছা দিয়ে চিপে রস বের করতে হয়। রসের মধ্যে যেহেতু পানি মিশ্রণ থাকে, সেহেতু তা পাতিলে করে জাল দিতে হয়। পাম গাছের চারা রোপণের আগে ১.৫-২.৫ ফুট সাইজের গর্ত করে গর্তের ওপর অংশের মাটি অন্য পাশে রেখে নিচের অংশের মাটির সঙ্গে গোবর ৫ কেজি, টিএসপি ২৫০ গ্রাম, এমপি ১৫০ গ্রাম, ইউরিয়া ১০০ গ্রাম প্রয়োজন হয়। গাছের গোড়া সব সময় আগাছা-মুক্ত রাখতে হয় এবং প্রয়োজনে স্বল্প পরিমাণ সেচ দিতে হয়। 

দেশে পাম অয়েলের বিপুল চাহিদা রয়েছে। উত্তরোত্তর এই চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপরন্তু দেশের ভূমি ও জলবায়ু পাম চাষের উপযোগী। ফলনও খুব ভালো। পাম গাছ ও পাম অয়েলের নানা উপকারিতা আছে। এর চাষের ব্যয় খুব কম। ফলে পাম চাষ খুবই লাভজনক। আন্তর্জাতিক সমীক্ষা সূত্রে জানা যায়, অন্যান্য কৃষি ফসল চাষ করে যেখানে হেক্টর প্রতি ১,২১০ ইউরো আয় হয়, সেখানে পাম চাষ করে ১,৬১৭ ইউরো আয় করা সম্ভব। তাই পাম চাষ দেশব্যাপী শুরু করা প্রয়োজন। কিন্তু এ ব্যাপারে চাষিরা যেহেতু ইতোপূর্বে তেমন উৎসাহী হয়ে উঠেনি, তাই সরকারিভাবে এর সূচনা করা দরকার। সে লক্ষ্যে সরকারি বনাঞ্চল, সেনা ও পুলিশ-আনসার ক্যাম্প, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাহাড়ের পাদদেশ, রাস্তা ইত্যাদি অর্থাৎ সরকারি সব জায়গায় সরকারি প্রচেষ্টায় পাম চাষ শুরু করা আবশ্যক এবং তা যথা-শিগগিরই। পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা দরকার। প্রয়োজনে ইনসেন্টিভ ঘোষণা করা যেতে পারে। তাহলে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যেতে পারে। অপরদিকে, পাম চাষে মানুষকে আগ্রহী করে তোলার জন্য এনজিও এবং প্রচারমাধ্যমগুলোরও অগ্রণী ভূমিকা পালন করা দরকার। তাহলেই স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশে পাম চাষের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। তৎপ্রেক্ষিতে কয়েক বছরের মধ্যেই ভোজ্য তেলের আমদানি অনেক হ্রাস পাবে। বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় সাশ্রয় হবে। এছাড়া, পাম চাষ, তেল উৎপাদন, বোতল-জাত ও বাজারজাতকরণ ও অন্যান্য কাজে লাখ লাখ প্রান্তিক মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান হবে। তাতে করে দারিদ্র্য হ্রাস পাবে। তাই পাম চাষের যে উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে তার দ্রুত সদ্ব্যবহার করা প্রয়োজন।