আর লাশের মিছিল দেখতে চাই না এখনই তা বন্ধ করতে হবে

 প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০১৯, ০৩:৫৯ অপরাহ্ন   |   প্রশাসন

আর লাশের মিছিল দেখতে চাই না এখনই তা বন্ধ করতে হবে

আমাদের মতো কলামিস্টদের জন্য হয়েছে মুশকিল। দু’দিন আগে ঠিক করি যে, অমুক বিষয় নিয়ে লিখবো। এই দুইদিনের মধ্যে ঘটে যায় আর একটি মারাত্মক ঘটনা। তখন সেটি নিয়ে লিখতে হয়। কিন্তু কোনো বিষয়ই কম গুরুত্ব রাখে না। গত ১৮ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাকশালের গুণগান গেয়েছেন। ২৬ মার্চ আবার দ্বিতীয় দফায় বাকশালের মাহাত্ম বর্ণনা করেছেন। ভেবেছিলাম, সেই বিষয়টি নিয়েই লিখবো। এর মধ্যে বনানীতে এফ আর টাওয়ারে ঘটলো মর্মান্তিক অগ্নিকান্ড। এই রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত সেখানে মারা গেছেন ২৬ জন আদম সন্তান। এর চেয়েও অনেক ব্যক্তি আহত এবং অনেকে নিখোঁজ। সুতরাং মৃতের সঠিক সংখ্যা আর কয়েকদিন পরেই জানা যাবে। তারও বেশ কয়েকদিন আগে চকবাজারে চুড়িহাট্টায় কেমিক্যাল গুদামে আগুন লেগে ৭১ ব্যক্তি এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। এর আগে রাজধানীর নিমতলীতে একই ঘটনায় অর্থাৎ কেমিক্যাল বিস্ফোরণে ১২৪ ব্যক্তি প্রাণ হারালেন। এইভাবে বেড়ে যাচ্ছে লাশের মিছিল। মানুষের জীবনের দাম যে এত সস্তা সেটি একমাত্র বাংলাদেশেই সম্ভব। দেখুন, বনানী অগ্নিকান্ডের পর দুইদিনও যায়নি। দুইদিন পর গুলশানে কাঁচাবাজারে আগুন লেগে ১ শত কোটি টাকারও বেশি সম্পদ ভস্মিভূত হয়েছে। গত ৩০ মার্চ শনিবার রাতে আমি বনানী দিয়ে আসছিলাম। আমি গিয়েছিলাম বনানী ২৩ নম্বর রোডের একটি বাসায়। সেখানে গিয়ে শুনি, ঐ ২৩ নম্বর রোডেই ঐদিন অর্থাৎ ৩০ মার্চ একটি বাসভবনে আগুন লেগেছে। তবে সৌভাগ্যের ব্যাপার, সময় মতো ব্যবস্থা নেওয়ায় সেই সাতমহলা বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে কিছু ক্ষতি হয়েছে। জান ও মালের কোনো অনিষ্ট হয়নি। আল্লাহর কাছে হাজার শোকর। 

অন্য দিকে দেখুন, এই রাজধানীতে বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা গেল ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র আবরার। উত্তর সিটি কর্পোরেশন তার নামে ফ্লাই ওভার বানাবে, এমন ঘোষণা দিয়ে পরদিন প্রাথমিক কাজ সারেন মেয়র। কিন্তু ঘাতক বাসের তান্ডব কি থেমেছে? গত বছর কিশোর-তরুণ ছাত্ররা নিরাপদ সড়কের দাবিতে সারা ঢাকাকে অচল করে দিয়েছিলো। সরকার অনেক প্রতিশ্রæতি দিয়ে ছাত্রদের ঐ আন্দোলকে থামিয়ে দেয়। তার পর কী হয়েছে? পরিস্থিতির কি বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়েছে? বরং তার চেয়েও আরও ঘোরতর অবনতি ঘটেছে। গত ২৮ মার্চ মাত্র একদিনে সারাদেশে ঘাতক বাস-ট্রাকের চাকার তলে পিষ্ট হয়ে মারা গেছেন ২৯ জন মানুষ। একটি ছোট্ট দেশে একদিনে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় ২৯ জন মানুষ, এটি কি কোনো সময় কল্পনাও করা যায়? আমরা কথায় কথায় লন্ডন-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়া-কানাডার উদাহরণ দেই। এইসব দেশে একদিনে ঘাতক ড্রাইভারের কারণে ২৯ জন লোক যদি মারা যায় তাহলে শুধুমাত্র ড্রাইভার এবং মালিকেরই শাস্তি হবে না, ঐ সরকারের গদি উল্টে যাবে। আর আমাদের দেশে? শত শত, হাজার হাজার মানুষ বাস এবং ট্রাকের চাপায় বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে। সরকারের কেশাগ্রও এতে নড়ছে না।

একেকটি দুর্ঘটনা ঘটে, আর সরকার এক ঝুড়ি ওয়াদা দিয়ে জনগণকে শান্ত করে। সেই সব ওয়াদার একটিও কি বাস্তবায়িত হয়েছে? পাকিস্তান আমলের কোনো রেফারেন্সই এখন আর টানা যায় না। তাদের ভালো কোনো কাজের রেফারেন্স টানলেই দালাল, রাজাকার বা পাকিস্তানি এজেন্টের ছাপ লেগে যায়। আমি পাকিস্তানের কোনো রেফারেন্স দিচ্ছি না। পাকিস্তান আমলের সড়কের কথা চিন্তা করুন তো। বাংলাদেশের ৪৮ বছরে অনেক রাস্তার সংযোজন হয়েছে। বাস-ট্রাকের সংখ্যা বেড়েছে। প্রাইভেট কারের সংখ্যা বেড়েছে। ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু কেউ কি আইন মানছে? একটি সাধারণ নিয়ম হলো, লালবাতি জ¦ললে জেব্রা ক্রসিং পার হওয়া যাবে না। আমরা কী দেখছি? জেব্রা ক্রসিংকে কেউ পাত্তাই দিচ্ছে না। লালবাতি জ¦লার আগে কিন্তু হলুদবাতি জ¦লে ওঠে। তারপর লালবাতি। হলুদবাতি জ¦ললে সাধারণত গাড়ির জেব্রা ক্রসিং পার হওয়া উচিত নয়। আর পার হলেও ধীরে সুস্থে দেখে শুনে পার হতে হবে। 

আমাদের এখানে কী হচ্ছে? সবুজবাতি, হলুদবাতি বা লালবাতির কোনো তোয়াক্কা কেউ করছে না। পথচারী যেমন ডানে বায়ে তাকিয়ে একটু ফাঁক পেলেই দৌড় মেরে রাস্তা পার হচ্ছে, তেমনি বাস-ট্রাকও এবং অনেক সময় প্রাইভেট কারও এধার-ওধার তাকিয়ে সবুজবাতি বা হলুদবাতির সময়েও জেব্রা ক্রসিং পার হচ্ছে। আর এই বেপরোয়া গাড়ি চালানোর জন্য অনেক পথচারী প্রাণ হারাচ্ছেন। আমি সেদিন কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডের আগে জেব্রা ক্রসিং হয়ে একটি সিএনজি দিয়ে যাচ্ছিলাম। সবুজবাতি জ¦লে গেছে। গাড়িগুলি জেব্রা ক্রসিং পার হওয়া শুরু করেছে। এরই মধ্যেই আমার সিএনজি জেব্রা ক্রসিংয়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে। ট্রাফিক পুলিশের উচিত ছিল আমার সিএনজিকে ফিরিয়ে দেওয়া। আমি সিএনজি ড্রাইভারকে বার বার বলছি যে, এর মধ্যে ঢুকোনা। ট্রাফিক পুলিশ আমার সিএনজিকে বলছে, ‘এই ব্যাটা, তাড়াতাড়ি পার হ।’ যাই হোক নিরাপদে রাস্তা পার হয়ে আমি নামলাম। আমি ট্রাফিক পুলিশকে জিজ্ঞাস করি, কেন আপনি সিএনজিকে এই অবস্থায় পার হওয়ার জন্য উসকে দিলেন? ট্রাফিক পুলিশ বললো, ‘স্যার এগুলো তো হামেশাই হচ্ছে।’ 

দুই

এই হলো ট্রাফিক পুলিশের অবস্থা। রিকশা এমনকি সিএনজিও রাস্তার ডান পাশ দিয়ে দেদারসে চলছে। অথচ ঐ কলাবাগান বাস স্ট্যান্ডেই রয়েছে ট্রাফিক পুলিশ এবং প্যাট্রোল পুলিশ। প্যাট্রোল পুলিশরা তো সারাদিন ওখানে বসে থাকে। আমি নিজেই ঐ দিক দিয়ে হাঁটাহাঁটি করে দেখেছি, ওরা সারাদিন বসে গল্প করে, চিনা বাদাম খায়, পাশের কলাপাতা রেস্টুরেন্ট থেকে পরোটা এনে খায়। অনেককে দেখেছি দুপুরবেলা পুলিশের গাড়ির মধ্যে বসে থেকে দিবানিদ্রা যায়। আর ট্রাফিক পুলিশদের দেখেছি, যতো না ডিউটি দেবে, তার চেয়ে তারা বেশি ব্যস্ত দু চারটি প্রাইভেট কার, সিএনজি অথবা রিকশা আটকিয়ে বাঁ হাতের কামাই কার্য সেরে নেবে। 

ঢাকা মেট্রো পলিটন পুলিশের কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়ার নিয়ত হয়তো ভালো। তিনি দৃঢ় ভাষায় বলেছেন, ‘১৫ দিনের মধ্যেই ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে।’ তিনি বলেন, এবার আর কোনো খাতির নাই। সকলের ব্যাপারে কড়া মনোভাব গ্রহণ করা হবে। আমি পুলিশের আইজি, ডিএমপি কমিশনার প্রমুখের সাফল্য কামনা করি। তাদেরকে বলবো, আপনারা মেহেরবানী করে নমুনা হিসাবে কয়েকটি রাস্তায় টহল দিন। দেখবেন ট্রাফিক লঙ্ঘন করে কী সাচ্ছন্দে রিকশা, সিএনজি এবং মটর সাইকেল রাস্তার বাম ধারের পরিবর্তে ডান ধার দিয়ে উল্টো পথে আসছে। আপনাদের বেশি দূর টহল দিতে হবে না। রাপা প্লাজা থেকে নিউ মার্কেট পর্যন্ত পূর্বাহ্নিক কোনো ঘোষণা না দিয়ে টহল দিন। দেখবেন রাস্তাটি সকলের জন্য ‘ফ্রি ফর অল’। এটি শুধু ধানমন্ডি কলাবাগান এরিয়াতেই নয়, এই অবস্থা সারা ঢাকা মহানগরীর জন্য প্রযোজ্য। 

ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে অনেক কথা আছে। প্রতিদিন টকশোতে অনেক ট্রাফিক এক্সপার্ট এবং পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আসছেন। তারা অনেক জ্ঞানগর্ভ সুপারিশ করছেন। আমি ঠাট্টা করার জন্য বলছি না। সত্যি সত্যিই তারা অনেক মূল্যবান পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু সরিষায় যেখানে ভূত থাকে সেখানে ভূত তাড়াবে কে?

এখন শোনা যাচ্ছে যে, ঢাকা মহানগরীতে হাজার হাজার ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল করে। একটি মাত্র মহানগরীতে এত ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল করে, এটি কি ভাবা সম্ভব? চিন্তা করলে মাথা ঘুরে যায়। বিষয়টি এমন গুরুতর পর্যায়ে গিয়েছে যে, মাননীয় হাইকোর্টকেও এব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। তাহলে এই ব্যাপারে বিআরটিএ বলুন বা সড়ক মন্ত্রণালয় বলুন বা সামগ্রিকভাবে সরকারকেই বলুন, তারা এতদিন কী করেছে? ২০১৭ সালের একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, তখন ঢাকায় ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা ছিল ৫৩ হাজার। মাত্র দুই বছরে সেটি ১৭ হাজার বেড়ে গিয়ে হয়েছে ৭০ হাজার। সরকার কি এতদিন নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়েছে? আমাদের কচি তরুণ সন্তানরা যখন মাঠে নেমে আসে তখন কুম্ভকর্ণরূপী সরকারের ঘুম ভাঙে। কয়েকদিন খুব সরফরাজি করে তারা। তার পর যথা পূর্বং তথা পরং। কুম্ভকর্ণ আবার ঘুমিয়ে পড়ে। এভাবে আর কতদিন?

তিন

ফিরে যাচ্ছি আবার অগ্নিকান্ডে। নব নিযুক্ত গৃহায়ণ মন্ত্রী অ্যাডভোকেট শ.ম রেজাউল করিম ভস্মীভূত এফ আর টাওয়ার বিল্ডিং পরিদর্শন করতে এসে বলেছেন, ‘ইট ইজ এ ক্লিন মার্ডার’। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা তাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, দোষী যেই হোক, কাউকে ছাড়া হবে না। এইখানে আইজিপি বলেছেন একটি চমৎকার কথা। ডিএনসিসি ১৭তলা নির্মাণের পরিকল্পনা পাস করে ছিল। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যেখানে অনুমোদন ছিল ১৭তলার, সেটা উঁচু হতে হতে ২২ বা ২৩ তলা হলো কীভাবে? আর এই ২২ বা ২৩ তলা তো আর দুই এক বছরে হয়নি। বেশ কয়েক বছর লেগেছে এই অতিরিক্ত ৫ তলা নির্মাণ করতে। বিল্ডিং কোড ভায়োলেট করে এই অতিরিক্ত ৫ তলা উঠলো কীভাবে? রাজউক কীভাবে সেটি অ্যালাও করলো? এত বছর হলো ঐ ৫ তলা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কীভাবে? এক্ষেত্রে রাজউক কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি? এসব প্রশ্ন কিন্তু আমাদের মতো পত্রিকাওয়ালাদের নয়, খোদ আইজিপির। 

আর একটি ভয়াবহ খবর হলো এই যে, এত বড় একটি ভবনের ইমারজেন্সি এক্সিট বা জরুরি বহির্গমনের পথ তালা দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল কেন? যদি এই এক্সিটটি খোলা থাকতো তাহলে মৃতের সংখ্যা অনেক কম হতো। এই ইমরাজেন্সি এক্সিট বন্ধ ছিল বলেই নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অবরুদ্ধ অনেক মানুষকে পাইপ বেয়ে নামতে হয়েছে অথবা ৭ তলা বা ৮ তলা থেকে ঝাঁপ দিতে হয়েছে। টেলিভিশনের ক্যামেরায় স্পষ্ট দেখা গেছে যে, এক ব্যক্তি পাইপ বেয়ে নামার সময় হাত পা পিছলে পড়ে যাচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখার পর সুস্থ মানুষেরও মাথা ঘুরে যায়।

এসব ঘটনা এবং আনুসাঙ্গিক আরও ঘটনা আপনারা পত্রিকায় পড়েছেন। তাই আমি আর বিস্তারিত বিবরণে গেলাম না। আমার প্রশ্ন হলো, আইন তো মেলাই আছে। কিন্তু সেগুলোর প্রয়োগ কোথায়? এ যেন সেই প্রবাদ বাক্যের মতো, কাজির গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নাই। গোয়ালে না থাকার জন্যই প্রতিবছর অগ্নিকান্ড, সড়ক দুর্ঘটনা, ট্রেন দুর্ঘটনা, লঞ্চ দুর্ঘটনা প্রভৃতি কারণে হাজার হাজার মানুষ মরে যাবে আর তাদের মৃত্যু নিয়ে সংবাদপত্রগুলোতে হৃদয় স্পর্শী বর্ণনা ছাপা হবে। কিন্তু যারা মারা যাচ্ছে তাদের নিকটজনদের বুক চাপড়ানি সারাবছর চলতেই থাকবে এবং বাড়তেই থাকবে। এই অবস্থা আর সহ্য হয় না। এটি আর চলতে পারে না। কবে মানুষ জেগে উঠবে? কবে তারা এসব ঘটনার নেপথ্য দানবদের ঘাড় মটকাবে?