আগামী নির্বাচনে অভিজাত বিরোধী স্লোগান

 প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৯, ০৪:০১ অপরাহ্ন   |   লাইফস্টাইল

আগামী নির্বাচনে অভিজাত বিরোধী স্লোগান

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের এখনো অনেক দেরি। কিন্তু ২০২০ সালে অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচনকে ঘিরেই জমে উঠেছে আমেরিকার রাজনীতির মাঠ। আর এবারের মাঠ গরম করা বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘অভিজাত’। মজার বিষয় হচ্ছে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট নির্বিশেষে সবাই ‘অভিজাত’ রাজনীতিকদের বর্জনের কথা বলছেন। তবে এই দুই ঘরানার কথিত ‘অভিজাত’ ধারণার মধ্যে রয়েছে যথেষ্ট ফারাক।

বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বর্তমানে তাঁর সবচেয়ে কঠোর সমালোচক আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ দুজনই অভিজাতদের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। যদিও নিউইয়র্ক থেকে সদ্য প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হওয়া ওকাসিও-কর্টেজ যাদের অভিজাত হিসেবে চিহ্নিত করছেন, তাদের থেকে ট্রাম্প-কথিত অভিজাত অনেকটাই আলাদা। দুজনের অভিজাত ধারণাতেই রয়েছে বিস্তর ফারাক। যেমন কিছুদিন আগে মিশিগানে এক সভায় ট্রাম্প অভিজাত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তাদের, যারা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো একটি ‘কম গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয় নিয়ে কথা বলছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে করা আন্দোলনকেই তিনি অভিজাতদের আন্দোলন বলছেন। বিপরীতে ওকাসিও কর্টেজ হচ্ছেন সেই তরুণ আমেরিকানদের প্রতিনিধি, যারা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সবচেয়ে সোচ্চার।

ইন্ডিয়ানার সাউথ বেন্ডের ডেমোক্র্যাট মেয়র পিট বাটিগিগ ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন বলে জোর গুঞ্জন চলছে। এই পিট বাটিগিগও ‘অভিজাত’ নিয়ে কথা বলছেন। সম্প্রতি সান ফ্রান্সেসকোর একটি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ট্রাম্পের ভোটারদেরই এলিট বা অভিজাত বলে আখ্যা দিয়েছেন।

অভিজাত বিশেষণটি অন্য অনেক ক্ষেত্রেই ইতিবাচক অর্থে ব্যবহার করা হলেও রাজনীতিতে এটি বরাবরই নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করা হয়। যদিও কোনো কিছুতে সেরা বোঝাতেই সাধারণত অভিজাত বিশেষণটি ব্যবহার করা হয়। অভিজাত অ্যাথলেট বা ক্লাব বলতে সেরা অ্যাথলেট বা ক্লাবকেই বোঝানো হয়। কিন্তু রাজনীতিতে অভিজাত বলতে তাদেরই বোঝানো হয়, যারা মনে করে তারাই সেরা। অর্থাৎ এই নিজেদের অভিজাত মনে করাতে জনসম্মতি নেই এবং এই অর্থে তারা জনবিচ্ছিন্নও। অন্তত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যাদের অভিজাত বলছেন, তারা এই অর্থেই অভিজাত। ট্রাম্প এই শব্দের ব্যবহার নতুন করছেন না। বিশেষত রিপাবলিকান সমর্থনপুষ্ট অঙ্গরাজ্যগুলোয় কোনো প্রার্থীকে বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করতে এই তকমাটির বহুল ব্যবহার রয়েছে। কারও গায়ে এই তকমাটি সেঁটে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে, এই লোকটি রাজনীতিক হলেও গণমানুষের নন। আর এই কৌশল বেশ কাজেও দেয়। কারণ রোনাল্ড রিগ্যান থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত হওয়া সব প্রেসিডেন্ট অন্তত একটি অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এলেও তাঁদের প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য শ্রমিক শ্রেণির সম্মতি আদায় করতে হয়েছে। বিশেষত শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবীদের সঙ্গে কোনো সংস্রব না থাকাটা আমেরিকার রাজনীতিতে কোনো অবস্থাতেই ইতিবাচক বলে বিবেচিত হয় না।

এখন তাকানো যাক বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে। সিএনএনের দৃষ্টিতে ট্রাম্প হচ্ছেন আভিজাত্যের সোনায় মোড়ানো সংস্করণ। তিনি শীত কাটাতে যান ফ্লোরিডার ব্যক্তিগত ক্লাবে, আর গ্রীষ্ম কাটাতে নিউজার্সির ব্যক্তিগত গলফ ক্লাবে। এই অভিজাত ক্লাবগুলো থেকেই তিনি জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির উসকে দিতে বলেন, অভিজাতরা থাকে শহরে আর উপকূলীয় এলাকায়। তিনি বলেন, উপকূলীয় এলাকায় থাকা অভিজাতরা ভালো চাকরি, বন্দুক থেকে শুরু করে স্বাধীনতার মতো সবকিছু সাধারণ মানুষ থেকে কেড়ে নিচ্ছে।

বিপরীতে এলিজাবেথ ওয়ারেন, বার্নি স্যান্ডার্স ও ওকাসিও-কর্টেজের মতো রাজনীতিকেরা অভিজাত চিহ্নিত করতে নির্দেশ করেন ওয়াল স্ট্রিটের দিকে। তাঁরা বলেন, ওয়াল স্ট্রিটই আমেরিকাকে আরও অসম করে তুলছে। শহরগুলো থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, এই অসাম্য তত বাড়ে। আমেরিকার নির্বাচনে ইলেক্টোরাল কলেজ পদ্ধতি অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে ক্ষমতারও অসাম্য সৃষ্টি করেছে।

সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়, শহর ও উপকূলীয় এলাকায় অভিজাতরা যতই ভিড় করে থাকুক না কেন, ভোটের সময় অভিজাতদের চেয়ে অভিজাতবিরোধীদের শক্তিই কিন্তু বেশি। কারণ ব্যালটে সাম্য আছে। আর অভিজাতদের তুলনায় অভিজাতবিরোধীদের সংখ্যা অনেক বেশি। এ কারণে রাজনীতির ময়দানে অভিজাতদের নিন্দা করাটাই সবচেয়ে লাভজনক। ট্রাম্প অভিজাতদের নিন্দা করলেও তাঁর মন্ত্রিসভায় অভিজাতরাই স্থান পেয়েছেন সবচেয়ে বেশি। ট্রাম্পের মন্ত্রিসভাসহ পুরো প্রশাসনই গড়ে উঠেছে বিত্তশালী ও উচ্চশিক্ষিতদের নিয়ে। এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের প্রচারের ধরনটিও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। তিনি অভিজাতবিরোধী স্লোগান তুলে গত নির্বাচনী প্রচারে নিজেকে বিরোধী পক্ষের চেয়ে বিত্তশালী, স্মার্ট ও বেশি সফল হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি তাঁর সমর্থকদেরও নিজের মতো অভিজাতবিরোধী অভিজাত হিসেবে আখ্যা দেন। এতে যে কাজ হয়েছিল, তা তাঁর বর্তমান পরিচয়ই বলে দিচ্ছে। এবারও তিনি সে পথেই এগোচ্ছেন। মিশিগানে গত ২৮ মার্চ দেওয়া ভাষণে অন্তত তেমনটিই দেখা গেছে।

তবে তরুণ ভোটারদের কাছে খুব অল্প সময়েই জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ওকাসিও-কর্টেজ অভিজাত ধারণার এত সরলীকরণে বিশ্বাসী নন। জলবায়ু পরিবর্তনের আন্দোলনকে অভিজাতদের আন্দোলন কিংবা উপকূলীয় অঞ্চল বা শহরে বসবাসকারীদের অভিজাত আখ্যা দেওয়াটা তাঁকে বরং ক্রুদ্ধ করে। তাঁর সোজাসাপ্টা কথা, এক বছর আগেও তিনি ম্যানহাটনের একটি দোকানে কাজ করতেন। আর জীবনের প্রথম স্বাস্থ্যবিমাটি তিনি পেয়েছেন কংগ্রেস সদস্য হওয়ার পর। গত সপ্তাহে প্রতিনিধি পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে ওকাসিও-কর্টেজ বলেছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিকে অভিজাতদের বিবেচ্য একটি বিষয় বলাটা হাস্যকর। এটি অভিজাত কোনো বিষয় নয়। এটি জীবনমানের প্রশ্ন। সাধারণ মানুষের বিশুদ্ধ বাতাস ও পানির যে চাহিদা, তাকে আপনি অভিজাত চাওয়া বলতে চান? তাহলে এই কথাটি আপনাকে বলতে হবে দক্ষিণ ব্রঙ্কসের শিশুদের, যেখানে শৈশবকালীন অ্যাজমার সর্বোচ্চ হার বিদ্যমান। মানুষ মরছে। আর অভিজাত ইস্যু বলে বিষয়টি পাশ কাটানো হচ্ছে।’

আমেরিকার রাজনীতিতে এবার অভিজাত প্রসঙ্গটি এমনভাবে উঠেছে, যা আগামী নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী মনোনয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। রিপাবলিকান রাজনীতিকেরা এই ইস্যুটিকে বহু বছর ধরে ব্যবহার করলেও ডেমোক্র্যাটরা এবারই প্রথম এতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। মার্কিন রাজনীতিতে রিপাবলিকান অঙ্গরাজ্যগুলো তুলনামূলক দরিদ্র, কম বৈচিত্র্যপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। বিপরীতে ডেমোক্রেটিক দলের মূল ভিত শহরাঞ্চলে। এই ভিতটিকেই এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলে সম্প্রসারিত করতে চান ডেমোক্র্যাট নেতৃবৃন্দ। এ ক্ষেত্রে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি নিয়ে এগিয়ে চলা ট্রাম্পও ছাড় দিচ্ছেন না। ওকাসিও-কর্টেজের প্রতিনিধি পরিষদে দেওয়া বক্তব্যের পরপর মিশিগানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যেই তার প্রমাণ রয়েছে।

লাইফস্টাইল এর আরও খবর: